
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক দিন। সরকার পতনের সেই দিনে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো বিয়ানীবাজারেও রাজপথে নামে ছাত্র-জনতা। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ক্ষোভ ও উত্তেজনার পর জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে বিয়ানীবাজারেও সৃষ্টি হয় ভিন্ন এক বাস্তবতা।
সেদিন ছাত্র-জনতার উপস্থিতি, মিছিল ও নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে বিয়ানীবাজার পৌরশহর। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় বিজয় উল্লাস। কারও হাতে ছিল লাল-সবুজের পতাকা, কারও চোখে ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
৫ আগস্ট ২০২৪, শ্রাবণের শেষ বিকেল। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পৌরশহরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিকেল ৫টার দিকে হঠাৎ গুলির শব্দে গর্জে ওঠে পুরো শহর। মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় রাজপথের বিজয় উল্লাস। গুলিতে লুটিয়ে পড়েন তারেক আহমদ, ময়নুল ইসলাম ও রায়হান উদ্দিন। গুলিবিদ্ধ হন দুবাগের নাজমুল ইসলাম তাজিম চৌধুরীসহ আরও অনেকে।
বিজয় উল্লাসের রাজপথ মুহূর্তেই পরিণত হয় আতঙ্কের স্থানে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বারুদের গন্ধ। রাস্তায় রক্ত আর পড়ে থাকা জুতা-স্যান্ডেল হয়ে ওঠে সেদিনের ঘটনার নীরব সাক্ষী।
স্বজন হারানোর বেদনা
শহীদ তারেক আহমদের মা ইনারুন নেসা বলেন, ‘এক বছরের মাথায়ও আমরা তার মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছি না। পিতার শোকে তার সন্তানরা কাঁদছে। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল আমার সন্তান।’
শহীদ ময়নুল ইসলামের স্ত্রী শিরিন বেগম বলেন, ‘বিজয় উল্লাসে গিয়ে ও আর ফেরেনি। আর ফিরবে না। সরকার আসবে-যাবে, কিন্তু সে আর আসবে না।’
মামলার অগ্রগতি নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, যারা জামিনে বের হয়ে আসছে, তাদের অনেকে প্রভাবশালীদের সহায়তায় বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।
নিহত কলেজ শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিনের বয়স ছিল ১৮ বছর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিজ বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়। পরিবারের সঙ্গে তিনি বিয়ানীবাজার পৌরসভার পূর্ব নয়া গ্রামে ভাড়া বাসায় থাকতেন।
বিয়ানীবাজার পৌরসভার পূর্ব নয়াগ্রামের ময়নুল ইসলামকে (৩২) স্থানীয় কবরস্থানে এবং মোল্লাপুর ইউনিয়নের কটুখালিপাড় এলাকার পারিবারিক কবরস্থানে তারেক আহমদকে (২৪) দাফন করা হয়। নিহতদের সবারই ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়।
এ ঘটনায় মামলার বাদী ও আহত নাজমুল ইসলাম চৌধুরী এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবর্তনের স্মৃতি, বিচারের প্রত্যাশা
৫ আগস্টের সেই দিনের ঘটনা বিয়ানীবাজারের মানুষের কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্মৃতি নয়; এটি একই সঙ্গে বিজয় উল্লাস, রক্তপাত, প্রাণহানি এবং স্বজন হারানো পরিবারের দীর্ঘশ্বাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ‘জুলাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়ানো সাহসী ছাত্র-জনতার বীরত্বের স্মারক। দীর্ঘ জুলুমের ইতিহাস থেকে মানুষের মনে যে ক্ষত ও দ্রোহের জন্ম নিয়েছিল, সেখান থেকেই অনেকে জীবন হাতে নিয়ে জুলাইয়ে রাজপথে নেমেছিলেন।’
শহীদদের সমাধিতে শ্রদ্ধা
৫ আগস্টের স্মরণে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নিহত শহীদ সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব, শহীদ রায়হান উদ্দিন, শহীদ ময়নুল ইসলাম ও শহীদ তারেক আহমদের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বিজয় উল্লাস থেকে গুলির শব্দ, তিনটি প্রাণহানি এবং পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মামলা—সব মিলিয়ে ৫ আগস্ট বিয়ানীবাজারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
দিনটি পেরিয়ে গেলেও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে ক্ষতটি এখনও তাজা। তাঁদের প্রত্যাশা—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
সেই দিনের বিয়ানীবাজারের ঘটনাগুলো আজও অনেকের স্মৃতিতে জীবন্ত।